ভ্যারিকোসিল (Varicocele): কী, কেন হয়, লক্ষণ ও কখন চিকিৎসা দরকার
লেখক ড. জাকি হাসান ৯ সেপ, ২০২৬১২ মিনিট পড়া২৩৯৯০০৪৫

ভ্যারিকোসিল আসলে কী?
আমাদের শরীরের অন্যান্য অংশের মতো অণ্ডকোষেও রক্ত সরবরাহ ও নিষ্কাশনের জন্য শিরা থাকে। কোনো কারণে অণ্ডকোষের এই শিরাগুলো অস্বাভাবিকভাবে ফুলে বা প্রসারিত হয়ে গেলে তাকে ভ্যারিকোসিল (varicocele) বলা হয়।
সহজ করে বললে, এটি অনেকটা পায়ের ভ্যারিকোজ ভেইনের মতোই - তবে এখানে সমস্যাটি হয় অণ্ডকোষের থলিতে (scrotum) থাকা শিরায়।
কয়েকটি বিষয় শুরুতেই জানা ভালো:
ভ্যারিকোসিল পুরুষদের মধ্যে একটি বেশ সাধারণ সমস্যা।
এটি সাধারণত বাঁ পাশে বেশি দেখা যায়, তবে দুই পাশেও হতে পারে।
এটি সাধারণত ক্যান্সার বা মারাত্মক কিছু নয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এর প্রভাব থাকতে পারে।
অর্থাৎ, ভ্যারিকোসিল থাকা মানেই বড় বিপদ নয়, কিন্তু বিষয়টি জেনে রাখা ও প্রয়োজনে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
ভ্যারিকোসিল কেন হয়?
শিরার ভেতরে ছোট ছোট ভালভ থাকে, যেগুলো রক্তকে সঠিক দিকে প্রবাহিত রাখতে সাহায্য করে। এই ভালভগুলো ঠিকভাবে কাজ না করলে রক্ত শিরায় জমে যেতে পারে, ফলে শিরা ফুলে ওঠে।
কেন কারও ক্ষেত্রে এমন হয়, তার নির্দিষ্ট কারণ সবসময় স্পষ্ট নয়। তবে সাধারণভাবে এটি অণ্ডকোষের শিরার গঠন ও রক্তপ্রবাহ সংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে জড়িত।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভ্যারিকোসিল বয়ঃসন্ধিকালে বা তরুণ বয়সে ধরা পড়ে, যখন অণ্ডকোষ ও এর রক্তপ্রবাহ দ্রুত বিকশিত হয়।
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি - এটি সাধারণত কারও কোনো "ভুল" বা অভ্যাসের কারণে হয় না। তাই এটি নিয়ে অপরাধবোধ বা লজ্জার কিছু নেই।
কী কী লক্ষণ দেখা যায়?
অনেক ক্ষেত্রেই ভ্যারিকোসিলের কোনো উপসর্গ থাকে না, এবং এটি অন্য কোনো পরীক্ষার সময় বা সন্তান ধারণে সমস্যার কারণ খুঁজতে গিয়ে ধরা পড়ে।
তবে যেসব ক্ষেত্রে লক্ষণ দেখা যায়, সেগুলো হতে পারে:
অণ্ডকোষে অস্বস্তি বা হালকা ব্যথা: সাধারণত দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, পরিশ্রম বা দিনের শেষে ব্যথা কিছুটা বাড়তে পারে এবং শুয়ে পড়লে কমে যেতে পারে।
অণ্ডকোষের থলিতে ফোলা বা "থলথলে" অনুভূতি: কখনো কখনো ফুলে যাওয়া শিরা "কেঁচোর থলি"র মতো অনুভূত হয়।
অণ্ডকোষের আকারে পার্থক্য: আক্রান্ত পাশের অণ্ডকোষ কিছুটা ছোট মনে হতে পারে।
সন্তান ধারণে সমস্যা: কিছু ক্ষেত্রে ভ্যারিকোসিল শুক্রাণুর মানে প্রভাব ফেলে সন্তান ধারণে অসুবিধা তৈরি করতে পারে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ কথা - অণ্ডকোষে হঠাৎ তীব্র ব্যথা, দ্রুত ফুলে যাওয়া বা শক্ত গুটি অনুভব করলে সেটি ভ্যারিকোসিল না-ও হতে পারে; এমন ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ভ্যারিকোসিল ও শুক্রাণুর সম্পর্ক
ভ্যারিকোসিল নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়টি হলো এর সঙ্গে শুক্রাণুর সম্পর্ক।
ফুলে যাওয়া শিরায় রক্ত জমে থাকার কারণে অণ্ডকোষের তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করা হয়, যা শুক্রাণু তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে কিছু ক্ষেত্রে ভ্যারিকোসিল শুক্রাণুর সংখ্যা বা মানের ওপর প্রভাব ফেলে সন্তান ধারণে অসুবিধা তৈরি করতে পারে।
তবে এখানে ভারসাম্য রাখা জরুরি:
সব ভ্যারিকোসিলই শুক্রাণু বা সন্তান ধারণে সমস্যা তৈরি করে না।
অনেক পুরুষের ভ্যারিকোসিল থাকা সত্ত্বেও তাদের সন্তান ধারণে কোনো অসুবিধা হয় না।
তাই ভ্যারিকোসিল ধরা পড়লেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। প্রকৃত প্রভাব আছে কি না, তা চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করবেন।
কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
ভ্যারিকোসিল নির্ণয় সাধারণত চিকিৎসকের শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে শুরু হয়। প্রয়োজনে কিছু পরীক্ষা যুক্ত হতে পারে।
শারীরিক পরীক্ষা: চিকিৎসক দাঁড়ানো ও শোয়া অবস্থায় অণ্ডকোষ পরীক্ষা করেন; কখনো গভীর শ্বাস নিয়ে চাপ দিতে বলা হতে পারে, যাতে ফুলে যাওয়া শিরা স্পষ্ট হয়।
আল্ট্রাসাউন্ড: নিশ্চিত হতে বা অন্য কোনো কারণ বাদ দিতে অণ্ডকোষের আল্ট্রাসাউন্ড করা হতে পারে।
বীর্য পরীক্ষা (semen analysis): সন্তান ধারণে সমস্যা বা শুক্রাণুর ওপর প্রভাব যাচাই করতে এটি করা হতে পারে।
এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে চিকিৎসক বুঝতে পারেন ভ্যারিকোসিলটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং আদৌ কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন আছে কি না।
চিকিৎসা: কখন দরকার, কখন নয়
সব ভ্যারিকোসিলের চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না - এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা।
উপসর্গহীন ভ্যারিকোসিল, যা ব্যথা বা শুক্রাণুর ওপর প্রভাব ফেলছে না, সাধারণত শুধু পর্যবেক্ষণেই রাখা হয়। এমন ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা করানোর দরকার নেই।
চিকিৎসক সাধারণত তখনই চিকিৎসার কথা বিবেচনা করেন, যখন:
এটি ক্রমাগত ব্যথা বা অস্বস্তির কারণ হয়
সন্তান ধারণে সমস্যা তৈরি করে বা শুক্রাণুর মানে প্রভাব ফেলে
আক্রান্ত অণ্ডকোষের বৃদ্ধিতে সমস্যা দেখা যায় (বিশেষত অল্পবয়সীদের ক্ষেত্রে)
প্রয়োজন হলে চিকিৎসক নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসা পদ্ধতির পরামর্শ দিতে পারেন, যা প্রকৃত অবস্থা ও কারণের ওপর নির্ভর করে। কোন পদ্ধতি উপযুক্ত, তা একজন যোগ্য বিশেষজ্ঞই নির্ধারণ করবেন।
এখানে একটি সতর্কবার্তা জরুরি। ভ্যারিকোসিল "ঘরোয়া উপায়ে সারানোর" নামে বাজারে পাওয়া তেল, তাবিজ বা অপরীক্ষিত ওষুধের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এসবের পেছনে সময় ও অর্থ নষ্ট না করে সঠিক নির্ণয় ও পরামর্শের জন্য চিকিৎসকের কাছে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের অবস্থাগুলোতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত:
অণ্ডকোষে দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি, ভারী অনুভূতি বা ব্যথা হচ্ছে
অণ্ডকোষের থলিতে ফোলা বা অস্বাভাবিক শিরা লক্ষ করছেন
এক পাশের অণ্ডকোষ ছোট মনে হচ্ছে বা আকারে পরিবর্তন দেখছেন
সন্তান ধারণে সমস্যা হচ্ছে
অণ্ডকোষে হঠাৎ তীব্র ব্যথা, দ্রুত ফোলা বা শক্ত গুটি অনুভব করছেন (এক্ষেত্রে দ্রুত পরামর্শ নিন)
এসব ক্ষেত্রে একজন urologist বা andrologist-এর পরামর্শ নেওয়াই সঠিক পথ। মনে রাখবেন, অণ্ডকোষের যেকোনো গুটি, ফোলা বা অস্বাভাবিকতা কখনোই অবহেলা করা উচিত নয় - এর প্রকৃত কারণ যাচাই করে নেওয়া নিরাপদ।
শেষ কথা
ভ্যারিকোসিল পুরুষদের একটি সাধারণ সমস্যা, যা প্রায়ই কোনো উপসর্গ ছাড়াই থাকে এবং সবসময় চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি ব্যথা বা শুক্রাণুর মানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তাই বিষয়টি জেনে রাখা ও প্রয়োজনে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো - উপসর্গ থাকলে বা সন্তান ধারণে সমস্যা হলে অপরীক্ষিত সমাধানের পেছনে না ছুটে একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। সঠিক নির্ণয়ই সঠিক সিদ্ধান্তের প্রথম ধাপ।
Medical Note
এই article শুধু সচেতনতা ও স্বাস্থ্যশিক্ষামূলক সাধারণ তথ্যের জন্য। এটি কোনো ব্যক্তিগত medical diagnosis বা treatment-এর বিকল্প নয়। অণ্ডকোষে কোনো উপসর্গ বা সন্তান ধারণে সমস্যা থাকলে অবশ্যই qualified doctor-এর পরামর্শ নিন।
FAQ - ভ্যারিকোসিল
ভ্যারিকোসিল কি বিপজ্জনক?
সাধারণত এটি ক্যান্সার বা মারাত্মক কিছু নয়, এবং অনেক ক্ষেত্রে কোনো সমস্যাই তৈরি করে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি ব্যথা বা শুক্রাণুর মানে প্রভাব ফেলতে পারে, তাই যাচাই করে নেওয়া ভালো।
ভ্যারিকোসিল থাকলে কি সন্তান হবে না?
জরুরি নয়। অনেক পুরুষের ভ্যারিকোসিল থাকা সত্ত্বেও সন্তান ধারণে কোনো অসুবিধা হয় না। প্রকৃত প্রভাব আছে কি না, তা বীর্য পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নে বোঝা যায়।
ভ্যারিকোসিলের কি সবসময় অপারেশন লাগে?
না। উপসর্গহীন ভ্যারিকোসিল সাধারণত শুধু পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। চিকিৎসা তখনই বিবেচনা করা হয়, যখন ব্যথা, শুক্রাণুর সমস্যা বা অণ্ডকোষের বৃদ্ধিজনিত সমস্যা থাকে।
ঘরোয়া উপায় বা ওষুধে কি ভ্যারিকোসিল সারানো যায়?
বাজারের তেল, তাবিজ বা অপরীক্ষিত ওষুধের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সঠিক নির্ণয় ও পরামর্শের জন্য চিকিৎসকের কাছে যাওয়াই সঠিক পথ।
ভ্যারিকোসিল কীভাবে ধরা পড়ে?
সাধারণত চিকিৎসকের শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে, এবং প্রয়োজনে আল্ট্রাসাউন্ড ও বীর্য পরীক্ষার মাধ্যমে ভ্যারিকোসিল নির্ণয় ও এর প্রভাব যাচাই করা হয়।
সাম্প্রতিক পোস্ট
নারীর যৌনস্বাস্থ্যযোনির স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা: সঠিক যত্ন ও প্রচলিত ভুল ধারণা
লেখক ড. জুবাইরাহ খান১ অক্টো, ২০২৬১২ মিনিট পড়া৭৬৫
নারীর যৌনস্বাস্থ্যযোনির সংক্রমণ (ইস্ট ও ব্যাকটেরিয়াজনিত): লক্ষণ, কারণ ও করণীয়
লেখক ড. জুবাইরাহ খান২৩ সেপ, ২০২৬১১ মিনিট পড়া৩২
দাম্পত্য ও যৌনজীবনযৌনস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী খাবার: বিজ্ঞান কী বলে
লেখক ড. জাকি হাসান ১৫ সেপ, ২০২৬১০ মিনিট পড়া৪৩
পুরুষের যৌনস্বাস্থ্যদেরিতে বীর্যপাত (Delayed Ejaculation): কারণ, করণীয় ও চিকিৎসা
লেখক ড. জাকি হাসান ১১ সেপ, ২০২৬৫ মিনিট পড়া৯৭
যৌনরোগ ও নিরাপদ যৌনতাডায়াবেটিস ও যৌন সমস্যা: সম্পর্ক, কারণ ও করণীয়
লেখক ড. জাকি হাসান ৭ সেপ, ২০২৬৫ মিনিট পড়া২৩৪
পুরুষের যৌনস্বাস্থ্যলিঙ্গের আকার নিয়ে ভুল ধারণা ও বাস্তবতা: যা জানা জরুরি
লেখক ড. জাকি হাসান ৬ সেপ, ২০২৬১১ মিনিট পড়া২১
পুরুষের যৌনস্বাস্থ্যশুক্রাণুর মান বাড়ানোর বৈজ্ঞানিক উপায়: খাবার, অভ্যাস ও করণীয়
লেখক ড. জাকি হাসান ২৩ আগ, ২০২৬১২ মিনিট পড়া৩৫৬
পুরুষের যৌনস্বাস্থ্যটেস্টোস্টেরন কমে গেলে কী হয়: লক্ষণ, কারণ ও করণীয়
লেখক ড. জাকি হাসান ৩ আগ, ২০২৬১০ মিনিট পড়া৯৮
পুরুষের যৌনস্বাস্থ্যস্বপ্নদোষ (Nightfall): ভুল ধারণা, বাস্তবতা ও যা জানা জরুরি
লেখক ড. জাকি হাসান ২ আগ, ২০২৬১২ মিনিট পড়া৩৩
নারীর যৌনস্বাস্থ্যমিলনের সময় ব্যথা (Dyspareunia): কারণ, করণীয় ও চিকিৎসা
লেখক ড. জুবাইরাহ খান৮ জুন, ২০২৬১১ মিনিট পড়া৬৫৭
যৌনরোগ ও নিরাপদ যৌনতাযৌনরোগ (STI/STD) কী? লক্ষণ, সংক্রমণের উপায় ও নিরাপদ যৌনতার নিয়ম
লেখক ড. জাকি হাসান ১৪ জানু, ২০২৬১১ মিনিট পড়া৫০০
দাম্পত্য ও যৌনজীবনস্বামী-স্ত্রীর যৌনসম্পর্ক ভালো রাখার উপায়: যোগাযোগ, সম্মতি ও ঘনিষ্ঠতার ১০টি বাস্তব টিপস
লেখক ড. জাকি হাসান ২ অক্টো, ২০২৫৮ মিনিট পড়া৬৮৭
পুরুষের যৌনস্বাস্থ্যপুরুষের যৌনস্বাস্থ্য: সহজ ভাষায় সম্পূর্ণ গাইড
লেখক ড. জাকি হাসান ২৫ ফেব, ২০২২১০ মিনিট পড়া৩৪

