পুরুষের বন্ধ্যাত্ব (Male Infertility): কারণ, পরীক্ষা ও করণীয়
লেখক ড. জাকি হাসান ৮ সেপ, ২০২৬১২ মিনিট পড়া৭৬৫
বন্ধ্যাত্ব বলতে আসলে কী বোঝায়?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে সাধারণত তখনই বন্ধ্যাত্বের কথা বলা হয়, যখন একটি দম্পতি নিয়মিত ও সুরক্ষা ছাড়া মিলনের পরেও দীর্ঘদিন (সাধারণত এক বছর) ধরে সন্তান ধারণে সফল হন না। বেশি বয়সের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা আরও কম হতে পারে। এখানে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার থাকা জরুরি- বন্ধ্যাত্ব শুধু নারীর বিষয় নয়। সন্তান না হওয়ার পেছনে কারণ শুধু নারীর হতে পারে, শুধু পুরুষের হতে পারে, আবার দুজনের ক্ষেত্রেই থাকতে পারে। কখনো কখনো নির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে না-ও পাওয়া যেতে পারে। তাই সন্তান না হলে শুধু একজনকে দায়ী করা বা দোষারোপ করা অন্যায় এবং ভুল।
সঠিক পথ হলো- দুজনকে একসঙ্গে বিষয়টি দেখা এবং প্রয়োজনে দুজনেরই পরীক্ষা করানো।
পুরুষের বন্ধ্যাত্ব কতটা সাধারণ?
অনেকেই মনে করেন সন্তান না হওয়ার কারণ প্রায় সবসময় নারীর দিক থেকে হয়। বাস্তবে এটি একটি বড় ভুল ধারণা। সন্তান না হওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্ষেত্রে পুরুষের কোনো না কোনো কারণ জড়িত থাকে- কখনো এককভাবে, কখনো নারীর কারণের সঙ্গে মিলিতভাবে। এই তথ্যটি জানা জরুরি এই কারণে যে, শুধু নারীর পরীক্ষা করিয়ে পুরুষের দিকটি এড়িয়ে গেলে প্রকৃত কারণ অজানাই থেকে যেতে পারে এবং সঠিক চিকিৎসাও পিছিয়ে যায়।
পুরুষের বন্ধ্যাত্বের প্রধান কারণগুলো পুরুষের বন্ধ্যাত্বের পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। এগুলোকে মোটাদাগে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়।
শুক্রাণু সম্পর্কিত কারণ: শুক্রাণুর সংখ্যা কম হওয়া, শুক্রাণুর চলাচল ক্ষমতা (motility) দুর্বল হওয়া, শুক্রাণুর গঠন (morphology) অস্বাভাবিক হওয়া, একেবারেই শুক্রাণু তৈরি না হওয়া বা বীর্যে না আসা।
শারীরিক ও স্বাস্থ্যগত কারণ: ভ্যারিকোসিল (অণ্ডকোষের শিরার সমস্যা), hormone-এর ভারসাম্যহীনতা (যেমন testosterone বা অন্যান্য hormone), অণ্ডকোষে আঘাত, অস্ত্রোপচার বা সংক্রমণের ইতিহাস, কিছু জন্মগত বা গঠনগত সমস্যা, কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগ বা এদের চিকিৎসা
যৌন সম্পর্কিত কারণ: উত্থানে সমস্যা (erectile dysfunction) বা বীর্যপাত সংক্রান্ত সমস্যা, যা মিলনে বাধা তৈরি করে
জীবনযাপন সম্পর্কিত কারণ: ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান, স্থূলতা, অতিরিক্ত তাপ ও কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ, অ্যানাবলিক স্টেরয়েড বা কিছু অপ্রয়োজনীয় ওষুধ অনেক ক্ষেত্রে একাধিক কারণ একসঙ্গে জড়িত থাকে, তাই প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে সঠিক পরীক্ষা জরুরি।
কী কী পরীক্ষা করা হয়?
পুরুষের বন্ধ্যাত্ব নির্ণয়ের প্রক্রিয়া সাধারণত ধাপে ধাপে হয়। চিকিৎসক প্রথমে বিস্তারিত ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে শুরু করেন, তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরীক্ষার পরামর্শ দেন।
সাধারণ কিছু পরীক্ষা:
বীর্য পরীক্ষা (semen analysis): এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পরীক্ষা, যেখানে শুক্রাণুর সংখ্যা, চলাচল ক্ষমতা ও গঠন যাচাই করা হয়।
hormone পরীক্ষা: testosterone সহ প্রয়োজনীয় কিছু hormone-এর মাত্রা দেখা হতে পারে।
শারীরিক পরীক্ষা: ভ্যারিকোসিল বা অন্য কোনো গঠনগত সমস্যা আছে কি না তা যাচাই করা হয়।
প্রয়োজনে অন্যান্য পরীক্ষা: কারণ অনুযায়ী চিকিৎসক আরও নির্দিষ্ট পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা - বীর্য পরীক্ষার ফল একবারে চূড়ান্ত ধরে না নিয়ে চিকিৎসক প্রয়োজনে কিছুদিন পর আবার পরীক্ষা করাতে পারেন, কারণ শুক্রাণুর অবস্থা সময়ের সঙ্গে ওঠানামা করতে পারে।
করণীয়:
জীবনযাপনে যেসব পরিবর্তন সাহায্য করে কারণ যেটাই হোক, কিছু সুস্থ অভ্যাস সামগ্রিক প্রজননস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এগুলো নিজে থেকে সব সমস্যার সমাধান না-ও করতে পারে, তবে সহায়ক ভূমিকা রাখে
ধূমপান ছাড়ুন ও মদ্যপান নিয়ন্ত্রণে রাখুন
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন ও নিয়মিত পরিমিত ব্যায়াম করুন
সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান
অতিরিক্ত তাপ এড়িয়ে চলুন (ঘন ঘন গরম পানির গোসল, কোলে দীর্ঘক্ষণ ল্যাপটপ রাখা ইত্যাদি)
মানসিক চাপ কমান ও পর্যাপ্ত ঘুম নিন
ক্ষতিকর রাসায়নিক ও স্টেরয়েড এড়িয়ে চলুন
এখানে একটি সতর্কবার্তা জরুরি।
বন্ধ্যাত্বের নিশ্চিত সমাধান, শতভাগ গ্যারান্টি বা সন্তান লাভের গোপন চিকিৎসা-এর নামে বাজারে পাওয়া তাবিজ, কবিরাজি বা অপরীক্ষিত ওষুধ থেকে দূরে থাকুন। এগুলো শুধু অর্থ ও সময়ের অপচয়ই নয়, প্রকৃত চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়ে ক্ষতিও করতে পারে।
চিকিৎসা প্রসঙ্গে জরুরি কথা পুরুষের বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে প্রকৃত কারণের ওপর নির্ভর করে। তাই সঠিক নির্ণয় ছাড়া সঠিক চিকিৎসা সম্ভব নয়। কারণ অনুযায়ী চিকিৎসক বিভিন্ন পথ বিবেচনা করতে পারেন - যেমন কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা, hormone সংক্রান্ত সমস্যা থাকলে তার ব্যবস্থাপনা, অথবা প্রয়োজনে বিশেষায়িত প্রজনন চিকিৎসা।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো - প্রতিটি ক্ষেত্রে সমাধান আলাদা, এবং তা নির্ধারণ করবেন একজন যোগ্য বিশেষজ্ঞ। ভালো খবর হলো, সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসায় অনেক দম্পতিই শেষ পর্যন্ত সন্তান ধারণে সফল হন। তাই হতাশ না হয়ে সঠিক পথে এগোনো এবং ধৈর্য ধরে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
মানসিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ সন্তান না হওয়ার বিষয়টি অনেক দম্পতির জন্য মানসিকভাবে কষ্টকর হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক চাপ, প্রশ্ন ও কখনো দোষারোপ। এই সময়ে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি:
এটি একটি চিকিৎসাবিষয়ক অবস্থা, কারও "অপরাধ" বা "ব্যর্থতা" নয়।
একে অপরকে দোষারোপ না করে পাশে থাকা সম্পর্ককে শক্তিশালী রাখে।
মানসিক চাপ তীব্র হলে একজন প্রশিক্ষিত counsellor বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সমর্থন এই কঠিন সময়টা সামলাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের অবস্থাগুলোতে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত:
নিয়মিত ও সুরক্ষা ছাড়া মিলনের পরেও প্রায় এক বছর ধরে সন্তান না হওয়া (স্ত্রীর বয়স বেশি হলে আরও আগে)
আগে অণ্ডকোষে আঘাত, অস্ত্রোপচার, সংক্রমণ বা ভ্যারিকোসিলের ইতিহাস থাকা
অণ্ডকোষে ব্যথা, ফোলা বা অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা
উত্থান বা বীর্যপাত সংক্রান্ত সমস্যা থাকা
যৌনস্বাস্থ্য বা hormone নিয়ে অন্য কোনো উদ্বেগ থাকা এসব ক্ষেত্রে একজন urologist, andrologist অথবা ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সঠিক পথ। এবং আগেই বলা হয়েছে - প্রয়োজনে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের একসঙ্গে পরীক্ষা করানো সবচেয়ে যুক্তিসংগত।
শেষ কথা পুরুষের বন্ধ্যাত্ব একটি সাধারণ এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরীক্ষাযোগ্য ও ব্যবস্থাপনাযোগ্য বিষয়। এটি নিয়ে লজ্জা, ভয় বা দোষারোপের কিছু নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো - সন্তান না হলে শুধু একজনকে দায়ী না করে দুজন একসঙ্গে বিষয়টি দেখা, সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত কারণ খোঁজা এবং যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। সঠিক তথ্য, ধৈর্য, পারস্পরিক সমর্থন আর বিশেষজ্ঞের সাহায্য - এই কয়েকটি মিলেই বেশিরভাগ দম্পতি সঠিক পথ খুঁজে পান।
Medical Note: এই article শুধু সচেতনতা ও স্বাস্থ্যশিক্ষামূলক সাধারণ তথ্যের জন্য। এটি কোনো ব্যক্তিগত medical diagnosis বা treatment-এর বিকল্প নয়। সন্তান ধারণ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে বা কোনো চিকিৎসা শুরু করার আগে অবশ্যই qualified doctor-এর পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্নঃ
প্রশ্নঃ সন্তান না হলে কি ধরে নেওয়া যায় সমস্যা নারীর?
না। সন্তান না হওয়ার কারণ নারী, পুরুষ বা উভয়ের ক্ষেত্রেই থাকতে পারে। তাই শুধু একজনকে দায়ী না করে প্রয়োজনে দুজনেরই পরীক্ষা করানো উচিত।
প্রশ্নঃ পুরুষের বন্ধ্যাত্ব নির্ণয়ের প্রধান পরীক্ষা কোনটি?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পরীক্ষা হলো বীর্য পরীক্ষা (semen analysis), যেখানে শুক্রাণুর সংখ্যা, চলাচল ক্ষমতা ও গঠন যাচাই করা হয়। প্রয়োজনে চিকিৎসক অন্যান্য পরীক্ষাও দিতে পারেন।
প্রশ্নঃ বন্ধ্যাত্ব কি সবসময় স্থায়ী?
না। কারণ অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রেই এটি ব্যবস্থাপনাযোগ্য, এবং সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসায় অনেক দম্পতি শেষ পর্যন্ত সন্তান ধারণে সফল হন।
প্রশ্নঃ বাজারের "সন্তান লাভের" তাবিজ বা কবিরাজি চিকিৎসা কি কার্যকর?
এসব অপরীক্ষিত সমাধান শুধু অর্থ ও সময়ের অপচয়ই নয়, প্রকৃত চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়ে ক্ষতিও করতে পারে। প্রকৃত কারণ জানতে ও চিকিৎসার জন্য যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রশ্নঃ জীবনযাপন বদলালে কি সত্যিই উপকার হয়?
ধূমপান ছাড়া, ওজন নিয়ন্ত্রণ, সুষম খাবার, অতিরিক্ত তাপ এড়ানো ও মানসিক চাপ কমানো প্রজননস্বাস্থ্যে সহায়ক হতে পারে। তবে এটি প্রকৃত কারণের ওপর নির্ভর করে, এবং কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।
সাম্প্রতিক পোস্ট
নারীর যৌনস্বাস্থ্যযোনির স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা: সঠিক যত্ন ও প্রচলিত ভুল ধারণা
নারীর যৌনস্বাস্থ্যযোনির সংক্রমণ (ইস্ট ও ব্যাকটেরিয়াজনিত): লক্ষণ, কারণ ও করণীয়
দাম্পত্য ও যৌনজীবনযৌনস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী খাবার: বিজ্ঞান কী বলে
পুরুষের যৌনস্বাস্থ্যদেরিতে বীর্যপাত (Delayed Ejaculation): কারণ, করণীয় ও চিকিৎসা
যৌনরোগ ও নিরাপদ যৌনতাডায়াবেটিস ও যৌন সমস্যা: সম্পর্ক, কারণ ও করণীয়
পুরুষের যৌনস্বাস্থ্যলিঙ্গের আকার নিয়ে ভুল ধারণা ও বাস্তবতা: যা জানা জরুরি
পুরুষের যৌনস্বাস্থ্যশুক্রাণুর মান বাড়ানোর বৈজ্ঞানিক উপায়: খাবার, অভ্যাস ও করণীয়
পুরুষের যৌনস্বাস্থ্যটেস্টোস্টেরন কমে গেলে কী হয়: লক্ষণ, কারণ ও করণীয়
পুরুষের যৌনস্বাস্থ্যস্বপ্নদোষ (Nightfall): ভুল ধারণা, বাস্তবতা ও যা জানা জরুরি
নারীর যৌনস্বাস্থ্যমিলনের সময় ব্যথা (Dyspareunia): কারণ, করণীয় ও চিকিৎসা
যৌনরোগ ও নিরাপদ যৌনতাযৌনরোগ (STI/STD) কী? লক্ষণ, সংক্রমণের উপায় ও নিরাপদ যৌনতার নিয়ম
দাম্পত্য ও যৌনজীবনস্বামী-স্ত্রীর যৌনসম্পর্ক ভালো রাখার উপায়: যোগাযোগ, সম্মতি ও ঘনিষ্ঠতার ১০টি বাস্তব টিপস
পুরুষের যৌনস্বাস্থ্য
